![]() |
| ছবি: প্রতিকী |
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে দেশে অন্তত ১৯৯ জন মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনায় নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এইচআরসিএফ) বলছে, এ ধরনের সহিংসতার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে শত শত পরিবারের জীবনে নেমে আসা চরম দুর্ভোগ।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী। তারা বলছেন, সরকার জিরো টলারেন্সের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এতে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এটি কি প্রশাসনিক অক্ষমতা, নাকি ইচ্ছাকৃত নীরবতা?
মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, “মব তৈরি করে সমাজে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে না। এ ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি।” তিনি আরও বলেন, ভয়ের কারণে অনেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, মব একটি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “মব কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিষয় নয়, এটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো—কারা এটি ব্যবহার করছে এবং কেন প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না?”
অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক আনু মুহাম্মদ সাম্প্রতিক ভাস্কর্য ভাঙচুর, মাজারে হামলা ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “এই ঘটনাগুলোর পেছনে কারা আছে, তা অজানা নয়। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় সহিংসতা আরও উৎসাহিত হচ্ছে।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “সরকার প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ—কোনোটিই কার্যকরভাবে করতে পারেনি। শুধু বিবৃতি দিলে হবে না, দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে পুলিশের ভূমিকা। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের উপস্থিতিতেই মব সহিংসতা ঘটছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এতে বাহিনীর সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কা বিরাজ করছে। সামান্য সন্দেহ, গুজব বা মতপার্থক্য থেকেই তৈরি হচ্ছে সহিংসতা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, চিকিৎসক—কেউই নিজেকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে এই সহিংসতার প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়বে। তারা বলছেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
