![]() |
| ছবি সংগৃহীত |
ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিষ্ঠানে আস্থাহীনতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে জর্জরিত বাংলাদেশ আজ এক অনিশ্চিত পরিবর্তনের পথে দাঁড়িয়ে আছে।
জুলাইয়ের সহিংস আন্দোলন: রাজনৈতিক সংকটের সূচনা
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘স্টুডেন্টস অ্যাগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন’-এর নেতৃত্বে সরকারী চাকরির কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও দ্রুতই তা শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবিতে রূপ নেয়।
নিরাপত্তা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের চাপে হাসিনা সরকারি বাসভবন ত্যাগ করে ভারতে প্রবেশ করলে অস্থিতিশীলতা আরও গভীর হয়।
ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
দেশে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। এর নেতৃত্বে আছেন ৮৫ বছর বয়সী নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি জানিয়েছেন— ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনিক সংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো depoliticisation এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও অগ্রগতি ধীরগতি এবং বিছিন্ন রয়ে গেছে।
সংবিধান সংশোধন, বিচার বিভাগ সংস্কার এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালুর প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো তীব্র মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছে।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে শঙ্কা
আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অনেক নেতার বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও তারা নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাপক রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি না হলে আসন্ন নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
২০২৪ সালের আন্দোলনের মধ্য থেকে জন্ম নেওয়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)—যদিও সরকার দলীয় পক্ষপাতিত্ব অস্বীকার করেছে—তারপরও নতুন দলটির ভূমিকাকে ঘিরে অবিশ্বাস রয়ে গেছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি: পুরনো অনুশীলনের ছায়া
মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা, গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং মামলা-হামলার ধারাবাহিকতা এখনো থামেনি।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন হামলা ও সংঘর্ষে অন্তত ২৬১ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) অভিযোগ করেছে—কিছু কর্তৃত্ববাদী কৌশল বন্ধ হলেও নতুন উদ্বেগজনক অনুশীলন দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে বিরোধী দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে টার্গেটেড অভিযান।
অন্তর্বর্তী সরকার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
‘জুলাই ঘোষণা’ ও গণভোটের প্রস্তুতি
২০২৪ সালের বিদ্রোহের পর তৈরি করা ‘জুলাই সনদ’ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর রোডম্যাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে ইউনূস জানান—ফেব্রুয়ারির নির্বাচন চলাকালীনই রাষ্ট্রীয় সংস্কার সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি জাতীয় গণভোট আয়োজন করা হবে।
সনদটির মূল লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে—
নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি
প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদসীমা নির্ধারণ
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি
মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
২০২৪ সালের বিদ্রোহকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া
সংসদে অনুমোদন পেলে এসব পরিবর্তন সংবিধানের অংশ হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন মোড়ে প্রবেশ করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর এখন দ্বৈত চাপ—
একদিকে স্বচ্ছ নির্বাচন, অন্যদিকে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বাস্তবায়ন।
আগামী কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহই নির্ধারণ করবে—দেশ স্থিতিশীলতার পথে এগোবে, নাকি আরও অস্থিরতার মুখে পড়বে।

