সিলেটে ইউরোপ পাঠানোর নামে প্রতারণা, ৭ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা যুবশক্তি ও ছাত্রদল নেতা

ভিক্টরি টাইমস ৭১

ছবি: সংগৃহীত 
নিউজ ডেস্ক: সিলেট থেকে ইউরোপে লোক পাঠানোর নামে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেছে ‘অ্যামেক্স এসোসিয়েটস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এই পতিষ্ঠান ইউরোপ পাঠানোর নামে গ্রাহকদের প্রায় সাত কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। এমন প্রতারণার নেতৃত্বে রয়েছেন ছাত্রদল ও যুবশক্তির দুই নেতা।


সিলেট নগরের উপশহরের সি-ব্লকের ৩৭ নম্বর রোডের ৪/এ নম্বর বাসায় অবস্থান কনসালট্যান্সি ফার্ম ‘অ্যামেক্স এসোসিয়েটস’-এর। সহযোগী ফ্যামেক্স ও ট্যাক্সকম নামে আর দুটি প্রতিষ্ঠান খোলা হয় অন্য জায়গায়। ২০২৪ সালের শেষদিকে প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর জন্য ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে। এমনকি ভুয়া লোক ও ভিসা দেখিয়ে ভিডিও প্রচার করা হয়।


প্রতিষ্ঠানের মালিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তি সিলেটের আহ্বায়ক জাবের আহমদ (সম্প্রতি অব্যাহতি) ও মহানগর ছাত্রদলের সদস্য ইমন উদ্দিন।


অভিযোগ উঠেছে, তারা প্রায় সাতশ তরুণ ও যুবককে ইউরোপে পাঠানোর প্রতিশ্রুতিতে তাদের কাছ থেকে এক লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। সরাসরি তাদের অফিসের মাধ্যমে দুইশ ও বিভিন্ন এজেন্টদের মধ্যে বাকি লোকদের কাছ থেকে তারা টাকা নেন। দীর্ঘদিনেও ভিসা না হওয়ায় অনেকে টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের উল্টো হুমকি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ভয় দেখানো হয় ভুক্তভোগীদের।


প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হলে ১৯ মে অফিস তালা লাগিয়ে গা-ঢাকা দেন জাবের ও ইমন। বিদেশে পালানোরও চেষ্টা করেন। অফিস তালাবদ্ধ করার পর প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজটি গায়েব করা (ডিজলভ) হয়।


প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী সিলেটের হরিপুর এলাকার বাসিন্দা নেওয়াজুর রহমান। মামলার এজাহারে বলা হয়, প্রায় সাতশ জনের কাছ থেকে অন্তত ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। মামলার পর দুজনকে আটক করেছে শাহপরাণ থানা পুলিশ।


প্রতারিত হওয়া ব্যক্তিদের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটির মূল কর্ণধার সিলেট জেলা যুবশক্তির সাবেক আহ্বায়ক  জাবের আহমদ। পরে যুক্ত হন ছাত্রদল নেতা ইমন উদ্দিন। তাদের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়। জাবের বিয়ানীবাজারের চান্দগ্রাম ও ইমন কামারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। আওয়ামী লীগ সরকার পতন-পরবর্তী সময়ে তারা পর্তুগাল, কানাডাসহ কয়েকটি দেশের ফাইল জমা নেন। ফাইল নেওয়ার সময় জাবের এনসিপি ও ইমন বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবিও কাজে লাগান। তারা পর্তুগালের জন্য এক লাখ ও কানাডার জন্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা অগ্রিম নেন। চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে ভিসা হওয়ার কথা থাকলেও বছর গড়িয়ে যায়। টাকা ফেরত চাইতে শুরু করে লোকজন। এক পর্যায়ে টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিতে শুরু করলে ভুক্তভোগীদের হুমকি ও মামলা দিয়ে হয়রানির ভয় দেখানো হয়। প্রতারিত ৮-১০ জনের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।


ভুক্তভোগীদের একজন কোম্পানীগঞ্জের ফারহান আহমদ। তিনি জানান, পর্তুগালের জন্য এক বছর আগে ১ লাখ টাকা দেন তিনি। টাকা ফেরতের জন্য অফিসে গেলে তাঁকে বহিরাগত তিন যুবক দিয়ে ভয় দেখানো হয়, অস্ত্র দেখানো হয়।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী জানান, গত মাসে অফিসে গিয়ে টাকার জন্য চাপ দিলে অফিসের নারীদের দিয়ে উত্ত্যক্ত করার মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে।


প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হলে ১৯ মে অফিস তালাবদ্ধ করে গা ঢাকা দেন জাবের ও ইমন। ওইদিন রাতে ৩০-৪০ জন ভুক্তভোগী নগরীর কুমারপাড়ার প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বাসায় গিয়ে ভিড় করেন। তিনি ওই দিন পুলিশ কমিশনারকে ভুক্তভোগীদের মামলা নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।


পরে মহানগরীর শাহপরাণ থানায় জাবের ও ইমনকে আসামিকে করে আরও পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন নিয়াজুর রহমান নামের এক ভুক্তভোগী। তিনি জানান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসার নামে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়। সেই টাকাই তারা মেরে দেয়। ভুয়া ভিসা ও ভুয়া লোক দেখিয়ে ফটোসেশন করে প্রচারণা করা হয়। লোকজন বিশ্বাস করে টাকা দেয়।অভিযোগ বিষয়ে জানতে জাবের ও ইমনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরসহ প্রতিষ্ঠানের তিনটি নম্বরে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।


সম্প্রতি ছাত্রদল নেতা ইমন বিদেশ পালানোর চেষ্টা করেন। পরে তাঁর পাসপোর্ট ব্লক করা হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।


সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী আহসান বলেন, ইমন উদ্দিন দলের কেউ নন। নেতাদের ছবি ব্যবহার করে অপকর্ম করলে এর দায় তাঁকেই নিতে হবে।

জাবেরের বিষয়ে জেলা এনসিপির এক নেতা জানান, নানা অভিযোগের কারণে জাবের আহমেদকে অনেক আগেই সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।


সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, যারা বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণা করেছে, তারা পুলিশের নজরদারিতে আছে। এরই মধ্যে দুজনকে আটক করা হয়েছে।

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top