![]() |
| নমুনা কার্ড |
এ কর্মসূচির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠান। প্রকল্প প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে উদ্বোধনী ও কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানের জন্য ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি সর্বোচ্চ সম্ভাব্য বরাদ্দ; প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় হবে, পুরো অর্থ খরচ নাও হতে পারে।
এদিকে সরকারি ব্যয় সংকোচনের সময়ে একটি অনুষ্ঠানের জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর মতে, এই অর্থ দিয়ে বিপুলসংখ্যক অসহায় মানুষকে সরাসরি সহায়তা দেওয়া সম্ভব। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা, তাই আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে উপকারভোগীদের ওপর ব্যয় বাড়ানো উচিত।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘সোশ্যাল প্রটেকশন ফর ইম্প্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং (এসএসপিআইআরআইটি)’ প্রকল্পের আওতায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৮১৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন খাতে সমন্বয় করে ফ্যামিলি কার্ড অংশের ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকায় নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।
তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ কর্মসূচির জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। এজন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর চলতি অর্থবছরেই থোক বরাদ্দ থেকে ১ হাজার ৫১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় পরিকল্পনা অনুযায়ী—
স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড প্রস্তুত ও বিতরণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫০ কোটি টাকার বেশি।
তথ্য সংগ্রহের জন্য ৬৬ হাজার ৮১৫টি ট্যাব এবং ৫টি সুপার কম্পিউটার কেনায় ব্যয় হবে ২২১ কোটি ৩২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।
দেশব্যাপী জরিপ পরিচালনায় ৬০ হাজার তথ্যসংগ্রহকারী নিয়োগ, তথ্য সংগ্রহ, ডেটা এন্ট্রি ও প্রসেসিংয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
মাঠপর্যায়ের তদারকিতে কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ভাতার জন্য ৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সেমিনার আয়োজনের জন্য ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় অতিরিক্ত ডাটা এন্ট্রি ও কম্পিউটিং সেবা আউটসোর্সিংয়ের পাশাপাশি দুটি জিপ ও আটটি মাইক্রোবাস ভাড়ায় ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে ৪১ লাখ মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে আরও পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
জরিপ কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে ইতোমধ্যে তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগস্ট মাসের মধ্যেই দেশব্যাপী জরিপ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কারিগরি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হলেও উপকারভোগী নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজধানীর কড়াইল বস্তিসহ কয়েকটি এলাকায় প্রকৃত নিম্নআয়ের বহু পরিবার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি কিংবা বাড়ির মালিকদের কেউ কেউ ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন।
এক অটোরিকশাচালক অভিযোগ করেন, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে গেলেও তিনি কোনো সহায়তা পাননি। অথচ তাঁর বাড়িওয়ালার নাম উপকারভোগীর তালিকায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকারভোগী নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে স্থানীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করা উচিত। এতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ কমে যাবে।
সরকারি নীতিমালায় ভূমিহীন, গৃহহীন, নারীপ্রধান ও অন্যান্য প্রান্তিক পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই নীতিমালা কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সারা দেশে সম্প্রসারণের আগে উপকারভোগী বাছাই, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
